বরিশালের পেয়ারা বাগান সম্পর্কে জানুন। এটি বাংলাদেশের এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিদর্শন। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত বরিশাল শুধু নদী ও খাল বিলের জন্যই বিখ্যাত নয়। তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ভাসমান বাজার এবং পেয়ারা বাগানের জন্যও বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত পরিচিতি লাভ করেছে।
পানির বুকে ভাসমান এই বাগান ও বাজার প্রতি বর্ষার মৌসুমে ভ্রমনপ্রেমিদের মন খুব সহজে জয় করে নেয়। এখানে শত শত কৃষক পানির ওপর ভাসমান জমিতে পেয়ারা চাষ করেন, যা বাংলাদেশের একমাত্র ভাসমান কৃষি ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। সেখানে প্রতিদিনই প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটে। আসুন আমরা জেনে নেই কীভাবে যাবো এবং কেন দেখবো এই বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য!

বরিশালের পেয়ারা বাগান
পেয়ারা বাগান একটি সুন্দর ও দর্শ নীয় স্থান। এখানে এসে অনেক আনন্দ উপভোগ করা যায়। পেয়ারা বাগান সম্পর্কে নিম্মে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
কোথায় অবস্থিত:
এটি বরিশাল বিভাগের (স্বরুপকাঠি,নলছিটি,বানারীপাড়া) এই তিনটি উপজেলা নিয়ে অবস্থিত। এই তিনটি উপজেলা ঘিরে রয়েছে অসংখ্য পেয়ারা বাগান। বরিশালের পেয়ারা বাগান বরিশাল শহর থেকে প্রায় ২০–২৫ কিলোমিটার দূরে এই তিনটি উপজেলা অবস্থিত। নিচে তিনটি উপজেলার পেয়ারা বাগানের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো।
স্বরূপকাঠি উপজেলা :
এটি হলো ভাসমান পেয়ারা বাজারের মূল কেন্দ্র। এখানে আসলে অনেক ভ্রমনতথ্য একসাথে উপভোগ করা যায়।
নলছিটি উপজেলা:
নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত পেয়ারা বাগান।
বানারীপাড়া উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানা এলাকা :
পর্যটকদের সবচেয়ে প্রিয় গন্তব্যস্থান। এখানে বিভিন্ন রকমের পেয়ারাে আসে।
বাবারিয়া ও চরকালুখালী অঞ্চল
এখানে আছে ঘন ঘন পেয়ারা গাছ ও ছোট ছোট নৌকার বাজার।
বরিশালের পেয়ারা বাগান,এই সব জায়গায় বর্ষামৌসুমে যখন নদীর পানি বাড়ে, তখন বাগানের চারপাশ নৌকায় ঘেরা থাকে। কৃষকরা নৌকায় করে পেয়ারা সংগ্রহ করে সরাসরি নদীর উপরেই বিক্রি করে। যার ফলে এই অঞ্চলটি একসময় বাংলার ভেনিস নামেও পরিচিতি পেয়েছিল।
যাওয়ার উপায়:
ভ্রমনপ্রেমিদের পেয়ারা বাগান দেখতে যাওয়ার জন্য অনেক মাধ্যম আছে। সবেচেয়ে সহজ মাধ্যমগুলো নিম্মে তুলে ধরা হলো।
গাড়িতে:
ঢাকা থেকে বরিশাালের পেয়ারা বাগান দেখতে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো বাস বা লঞ্চে ভ্রমণ করা। ঢাকার গাবতলী,গুলিস্থান ও সায়েদাবাদ থেকে প্রতিদিন অনেক এসি/নন এসি পরিবহন বাস সরাসরি বরিশালের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।
ভাড়া সাধারণত এসি/নন এসি অনুযায়ি ৫০০–৮০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। জনপ্রিয় বাস সার্ভিসগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ শ্যামলী, ঈগল, হানিফ, এক্সপ্রেস, এবং সোহাগ পরিবহন। বাসে যেতে সময় লাগে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। আপনি চাইলে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঢাকা মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে সরাসরি পেয়ারা বাগান দেখতে আসতে পারেন। সেখানে গাড়ি পার্কিংয়ের সু-ব্যবস্থা আছে।
লঞ্চে:
যারা একটু আরামদায়ক ভ্রমন করতে চান তারা ঢাকা সদরঘাট থেকে প্রতিদিন অনেক বিলাসবহুল লঞ্চ বরিশাালের উদ্দেশ্যে ছেরে আসে। ভ্রমনপ্রেমিরা ইচ্ছে করলে লঞ্চে বরিশাল আসতে পারেন। এই রুটে ভ্রমণ করলে নদীপথের(নদীপথ শান্তির নীড়) সৌন্দর্যও উপভোগ করা যায়।
লঞ্চে বা গাডিতে বরিশালে এসে, বরিশাল শহর থেকে স্থানীয়ভাবে ভাড়ায় চালিত গাড়ি বা মোটরসাইকেল করে ঝালকাঠি,বানারীপাড়া,স্বরুপকাঠি,নলসিটি এবংআটঘর কুড়িয়ানা এলাকায় যেতে পারেন। সেখান থেকে ছোট ছোট নৌকা বা ট্রলার ভাড়া করে অত্যান্ত স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে বাগানগুলো ঘুরে দেখা যায়
ভ্রমণের সেরা সময়:
বরিশালের পেয়ারা বাগান ঘুরে দেখার সবচেয়ে প্রকৃত সময় হলো প্রতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত। তখন সেখানের পেয়ারা গাছে পাকা পেয়ারা ফল ঝুলে থাকে। পাকা পেয়ারা ঝুলে থাকার দৃশ্যটা ভ্রমনপ্রেমিদের আকর্ষনীয় করে তোলে। আরো আকর্ষনীয় করে তোলে যখন নদীর পানি চারদিকে উপচে পড়ে।
থাকার ব্যবস্থা:
পেয়ারা বাগান দেখতে গিয়ে থাকার ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিম্মে তুলে ধরা হলো।
১. বরিশাল শহরে হোটেল ও রিসোর্ট
বরিশালের পেয়ারা বাগান দেথতে গিয়ে যদি তুমি শহর থেকে ভ্রমণ করতে চাও, তাহলে বরিশাল শহরে অনেক ভালো মানের হোটেল ও গেস্ট হাউস রয়েছে।
জনপ্রিয় হোটেলগুলো:
Hotel Grand Park Barishal: আধুনিক রুম, এয়ারকন্ডিশন, ফ্রি ওয়াইফাই ও রেস্টুরেন্ট সুবিধা। হোটেলটি অতত্যন্ত মনোরম,পরিস্কার পরিছন্ন এবং সবমিলিয়ে খুবই সুন্দর একটা পরিবেশ উপভোগ করা যায়।
Hotel Athena International: এই হোটেলটি হলো পারিবারিক পরিবেশের। পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।
Hotel Paradise : এটি হলো সাশ্রয়ী মূল্যের হোটেল। দম্পতি বা বন্ধুবান্ধবদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
ভাড়া: প্রতি রাত ১,০০০ টাকা থেকে ৩,৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে (রুম টাইপ অনুযায়ী)।
পরামর্শ:
যদি তুমি সকালে পেয়ারা বাগান দেখতে যেতে চাও,তাহলে বরিশাল শহরেই রাতে থেকে সকালে ইজিবাইক,বাস বা ভ্যানযোগে স্বরূপকাঠি বা বানারীপাড়ায় যেতে পারো।
২. গ্রামীণ হোমস্টে:
পেয়ারা বাগানের আশেপাশের গ্রামে অনেক স্থানীয় পরিবার পর্যটকদের জন্য হোমস্টে ব্যবস্থা রাখে।
তুমি চাইলে গ্রামের মানুষের ঘরে থেকেও প্রকৃত গ্রামীণ আতিথেয়তার স্বাদ নিতে পারো। এটা হবে ভ্রমনপ্রেমিদের জন্য ভিন্ন একটা অভিঙ্গতা।
সুবিধা:
স্থানীয় খাবার ও ফলমূল।
নৌকা ভ্রমণ।
প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা।
খরচ: জনপ্রতি প্রায় ৫০০–৮০০ টাকা (খাবারসহ)।
খাওয়ার ব্যবস্থা:
১. গ্রামীণ খাবারের স্বাদ:
এখানের খাবারের তালিকায় থাকবে ভাত, ডাল, দেশি মাছ (রুই, কাতলা, শোল, চিংড়ি টেংরা), শাকসবজি। আর মিষ্টি হিসেবে নারকেলের মোয়া বা গুড়ের পিঠা। গ্রামের গৃহিণীরা সম্পূর্ণ দেশি পদ্ধতিতে রান্না করেন। গৃহিণীরা কাঠের চুলায় রান্না করেন, যা খাবারে দেয় ভিন্ন স্বাদ।
২. নৌকায় পেয়ারা খাওয়ার আনন্দ:
ভাসমান পেয়ারা বাগানে সবচেয়ে মজার/কৌতুহলের বিষয় হলো নৌকায় বসে সরাসরি গাছ থেকে তুলে পেয়ারা খাওয়া। বিক্রেতারা নৌকা থেকে পেয়ারা তুলে তোমার হাতে দেবে। ইচ্ছে করলে তুমি নিজেও গাছ থেকে পেয়ারা তুলে নিতে পারবা। চাইলে তাজা পেয়ারা, কলা, ডাব, ও দেশিয় ফল ক্রয় করে নিয়ে আসতে পারো।
৩. বরিশাল শহরে রেষ্টুরেন্ট খাবার
যদি তুমি শহরে ফিরে খাবার খেতে চাও, তাহলে কিছু জনপ্রিয় রেষ্টুরেন্ট হলো:
Hotel Grand Park Restaurant: এখানে দেশি-বিদেশি খাবারের আয়োজন করা হয়।
Ruposhi Bangla Restaurant: স্থানীয় মাছ ও কীর্তনখোলা নদীর ইলিশের বিশেষ পদ পাওয়া যায়।
Café Rio Barishal: এটি কফি ও ফাস্টফুডের জন্য বেশ জনপ্রিয়।
পেয়ারা বাগানের বিশেষত্ব:
এই অঞ্চলের পেয়ারা বাগানগুলোর সবচেয়ে আকর্ষনীয় বৈশিষ্ট্য হলো, বাগানগুলো জমিতে নয়, পানির উপরে ভাসে।
চাষিরা খড়, কচুরিপানা ও কাঁঠালপাতা দিয়ে ভাসমান মাচা তৈরি করে। আর সেই মাচার উপরে চাষিরা পেয়ারা গাছ রোপণ করেন।আর এটাই হলো বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী “ভাসমান কৃষি প্রযুক্তি ।যা এখন ইউনেস্কো এর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পেয়ারা বাগানের ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য:
বরিশালের ভাসমান পেয়ারা বাগানের ইতিহাস প্রায় দেড় শতাব্দী পুরনো। স্থানীয় কৃষকরা খাল ও নদীর তীরে ছোট ছোট ডোবা ও উঁচু জমিতে পেয়ারা চাষ শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে এটি একটি ভাসমান কৃষি ব্যবস্থা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। বর্ষার মৌসুমে কৃষকরা নৌকায় করে পেয়ারা বাগানে যান এবং ফল সংগ্রহ করেন। তখন কাছের খালে তৈরি হয় ভাসমান পেয়ারা বাজার, যা এক অনন্য পর্যটন আকর্ষণ।
ভাসমান বাজারের সৌন্দর্য:
প্রতি বছর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই অঞ্চলের পানিতে ভেসে থাকে শত শত নৌকা ও ট্রলার ভর্তি পেয়ারা। ভোরবেলা নদীর বুকে দেখা যায় পেয়ার বিক্রেতা, ক্রেতা ও পর্যটকদেরে এক মহামিলনমেলা।
রঙিন ছাউনি, হাসিখুশি মুখ আর পানির উপরে সাজানো পেয়ারা, এ যেন এক জীবন্ত চিত্রকর্ম।পর্যটকরা ছোট নৌকায় করে এই পেয়ারা বাজার ঘুরে দেখতে পারেন এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে টাটকা পেয়ারা কিনে নিতে পারেন।
পেয়ারা বাগানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব
পেয়ারা চাষ বরিশাল অঞ্চলের হাজারো কৃষকের জীবিকা জীবিকা ও অর্থনীতির প্রধান উৎস। এখানকার প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে পেয়ারা চাষ বা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত আছেন। এছাড়া এই ভাসমান বাজার পর্যটন শিল্পকেও শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এখানে এসে ভিড় জমায়,যা স্থানীয় অর্থনীতিকে নতুন প্রাণ দেয়।
ভ্রমণ পরামর্শ:
বর্ষাকাল (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) হলো ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
নদীপথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করতে হলে সকাল সকাল বের হতে হবে।
ক্যামেরা বা ড্রোন নিতে ভুলবেন না। ভাসমান বাগানের সৌন্দর্য অনন্য।
স্থানীয় গাইড সঙ্গে রাখলে সহজে ভ্রমনকরা ও কেনাকাটা করা যায়।
ভদ্র আচরণ করুন, প্রকৃতিকে নষ্ট করবেন না।
স্থানীয় কৃষকদের সহায়তা করুন, সরাসরি তাদের কাছ থেকে ফল কিনুন
সমাপ্তি:
বরিশালের ভাসমান পেয়ারা বাগান শুধু একটি কৃষিক্ষেত্র নয় বরং এটি প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের সম্পর্কের এক জীবন্ত উদাহরণ। এখানে গেলে মনে হয়, পৃথিবীর কোথাও যেন এমন মায়াবী জলফসলের রাজ্য নেই। শান্ত নদীর বুকে ভেসে থাকা সেই পেয়ারা বাগান সত্যিই এক বাংলাদেশের প্রাকৃতিক রত্নভাণ্ডার।

Leave a Reply